সাহিত্য

রাহেলা

বাবলু ভঞ্জ চৌধুরী

প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০২৬ ০৩:২৫ | ৭৫

‘এই দেখ, আমার প্লেন বিধ্বস্ত হচ্ছে!’ টেবিলের ওপর একটি কলমের গায়ে হাতের খেলনা প্লেনটিকে জোরে ধাক্কা মেরে বলল রাহাত, মুখে সেই বেগে ভোঁ ভোঁ আওয়াজ, ‘আমি কিন্তু ওর মধ্যে ছিলাম না, প্যারাশুট দিয়ে আগেই নেমে গিয়েছিলাম!’

একটু দূরে বসে ছিলেন দাদু। রাহাতের কথায় চমকে হেসে উঠে মনে মনে আউড়ালেন, ‘যুগের শিক্ষা!’

গত বছর বাংলাদেশের একটি স্কুলের ওপর বিমান বিধ্বস্ত হয়েছে।

এখন ইরানে যুদ্ধ চলছে, সেখানেও একটি স্কুলের ওপর মিসাইল পড়েছে। চারদিকে বিধ্বস্ত হওয়ার খবর শুনে শুনে ‘বিধ্বস্ত’ শব্দটায় অভ্যস্ত হয়ে গেছে পাঁচ বছরের রাহাত। এটা এখন তার খেলার অনুষঙ্গ।
আজ তিন দিন হলো ঈদের ছুটিতে গ্রামে এসেছে রাহাত।

এরই মধ্যে ওপাড়ার মাহিরের সঙ্গে বেশ খাতির হয়েছে। তার সঙ্গেই চলছে এসব কাণ্ডকারখানা। কিন্তু একটানা বসে বসে ওসব শুনতে ভালো লাগছিল না মাহিরের। ছুটে ছুটে চলে যাচ্ছিল।

তখনই মাটিতে কেঁদে গড়িয়ে পড়ছিল রাহাত। মাহিরকে তার লাগবেই লাগবে। শেষে এই কাজে সাহায্য করল ছোট মামা। চকোলেট-টকোলেট দিয়ে মাহিরকে ধরেবেঁধে বসিয়ে রাখা হয়েছে।
পাশের ঘরে রাহাতের মা তাঁর ছোটবেলার বান্ধবী লাবণ্য আন্টির সঙ্গে গল্প করছেন।

লাবণ্য আন্টির মেয়েটা কোল ঘেঁষে বেঁকে দাঁড়িয়ে মোবাইলে ঘটাং ঘটাং খেলছিল। আন্টি হাত ঠেলে সরিয়ে দিতেই মোবাইলটা রেখে এক পা দুই পা করে রাহাতদের ঘরে ঢুকল। কিন্তু কেউ তাকে খেয়াল করল না। সেও রাহাতদের ওসব খেলা বুঝতে পারছে না। শেষে মিনমিন করে বলল, ‘আমি ছড়া জানি!’ কিন্তু কেন জানি রাহাত তখন আরো বেশি করে মুখে ভোঁ ভোঁ আওয়াজ করতে লাগল! অগত্যা মেয়েটি সুর করে ছড়াই বলে ফেলল, ‘বইমেলাতে ঘুরছিল এক পাঠক/লেখক এসে করল তাকে আটক...’ আহমেদ সাব্বিরের লেখা এই ছড়া শুনে দাদু এবার খ্যাঁকখ্যাঁক করে হেসে উঠলেন, হাসির চোটে কেশেই ফেললেন। সেই শব্দে হঠাৎ সব চুপসে গেল!

রাহাতদের উঠানে ফাগুনের হাওয়া, পাখির কাকলি; ফেব্রুয়ারির এই সকালে ছায়ার মধ্যে ডিমের খোলার মতো লালচে রোদ। বাবা সেখানে হাট বসিয়েছেন। সারা গ্রাম থেকে বন্ধুবান্ধব এসেছেন দেখা করতে, বাবা তাঁদের সঙ্গে গল্প করছেন। রাহাতের বড় বোন রাহেলা তাঁদের মধ্যে দাঁড়িয়ে হাঁ করে বাবার কথা শুনছে। তার খুব ইচ্ছা হচ্ছে বাবার মতো কথা বলতে। এই বাতিক রাহেলার আছে। ছোটবেলায় বাবাকে কারো সঙ্গে মোবাইলে কথা বলতে দেখলে, ‘আমি বলব আমি বলব’ করে মোবাইল নেওয়ার জন্য হাত বাড়াত। এখন একটু বড় হয়ে সে অভ্যাস বাইরে দেখা যায় না ঠিকই, কিন্তু মনে তার একটুখানি এখনো আছে। রাহেলা চঞ্চল হয়ে আছে কথা বলতে, কিন্তু কোনো চান্স পাচ্ছে না। বাবা কাকে যেন জিজ্ঞেস করলেন, ‘আক্কাস ভাইয়ের কী অবস্থা?’

‘খুব খারাপ, নিরুদ্দেশ!’ উত্তর দিল সেই লোকটি।

‘কেন?’

তারপর সেই লোকটি কিসব ঋণটিনের কথা বলল। রাহেলা কিছুই বুঝল না। বাবা একেবারে চুপ হয়ে মাথা নিচু করে থাকলেন, যেন খুব সিরিয়াস কিছু। তারপর মুখ তুলে বললেন, “ পাঁচশ বছর আগে ফেং মেংলং নামে চীন দেশে এক পণ্ডিত ছিলেন, তিনি বাস্তব জীবন থেকে কিছু ঘটনা নিয়ে লোকশিক্ষামূলক গল্পের একটা সংকলন করেছিলেন, আক্কাস ভাইয়ের কথা শুনে মনে পড়ছে, সেই গল্পগুলোর একটায় আছে—আয়ু শেষ হলে জীবনাবসান হয় না, ভাগ্য শেষ হলেই জীবনাবসান হয়। বাবার এই কথায় সবাই একেবারে চুপ হয়ে গেল। রাহেলা ভাবল, এই সুযোগ! তাড়াতাড়ি বলল, ‘বাবা, তুমি যে বলেছিলে আমাদের গ্রামে এক বটগাছের দরজা-জানালা আছে! আমি সেটা দেখব!’ উঠান দিয়ে সেই সময় ছোট মামা যাচ্ছিল, বাবা বড্ড নীরসভাবে তাকে বললেন, ‘অ্যাই রাতুল, একে ওই মাঠের বটগাছটা দেখিয়ে আন তো!’ ঠিক তখন ঘরের ভেতর থেকে জোরে গলা খাঁকারি দিয়ে উঠলেন দাদু, ‘না না, আমি নিয়ে যাব!’ বয়সের ভারে দাদু কুঁজো হয়ে আছেন, লাঠি নিয়েও ভালো হাঁটতে পারেন না। তাঁর এমন কথায় সব থ হয়ে গেল। অন্য ঘর থেকে রাহাতের মা নিষেধ করলেন, ‘না না বাবা, আপনি...’ কিন্তু বৃদ্ধ ‘আমি যাবই যাব’ বলতে বলতে ততক্ষণে হাসিমুখে বারান্দায় বেরিয়ে এসেছেন, ফাগুনের হাওয়ায় তাঁর লম্বা সাদা চুল উড়ছে।

চারপাশ গাছগাছালিতে ঘেরা একটা মাঠ, মাঠের মাঝখানে ঝাঁকড়া একটা বটগাছ। দাদুর হাত ধরে সেটার সামনে এসে দাঁড়াল রাহেলা। দাদু বটগাছের দিকে হাত বাড়িয়ে বললেন, ‘গাছের গায়ে এইখানে দরজা ছিল, সেই দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকলে একটা রাজপ্রাসাদ দেখা যেত, সেই রাজপ্রাসাদে এক রাজকন্যা ঘুমিয়ে থাকত! কিন্তু সেসব আর নেই।’

‘কেন?’ বড্ড হতাশ হয়ে জিজ্ঞেস করল রাহেলা।

‘বিধ্বস্ত হয়েছে।’ কথাটা বলেই দাদু জিজ্ঞেস করলেন, ‘বিধ্বস্ত কারে বলে জানো তো?’

‘হুঁ’, গাছের দিকে তাকিয়ে শান্তভাবে বলল রাহেলা, ‘কেন? এখানে কি মিসাইল পড়েছিল?’

‘মি-সা-ই-ল!’ মুখের মধ্যেই কথাটা আউড়ালেন দাদু, তারপর বিড়বিড় করে যেন নিজেকেই বললেন, ‘যুদ্ধ-মোবাইল-মিডিয়া!’ রাহেলা কিছুই বুঝল না, শুধু সেই বিশাল বিচিত্র গাছটার দিয়ে তাকিয়ে থাকল। দাদু এবার হেসে বললেন, ‘তবে একটা জিনিস এখনো আছে!’ অসংখ্য ঝুরি ঝুলছে, সেগুলোর কয়েকটায় তক্তা বেঁধে ঝুলনা তৈরি করা, সেটা দেখিয়ে বললেন, ‘এখানে এসো তো দাদু!’ গায়ে যেন হঠাৎ জোর হয়েছে দাদুর। দুই হাতে রাহেলাকে সেটার ওপর তোলার চেষ্টা করতেই এক লাফে রাহেলা সেটায় চেপে বসল। ঝুলছে! ঝুলছে আর ভাবছে, ‘এই বুঝি রাজপ্রাসাদ!’ পুরো বটগাছটিকে তখন দাদুর মতো লাগছে। দাদু ঘাস-লতার মধ্যে দাঁড়িয়ে ফোকলা মুখে হাসছেন, বললেন, “একটা ছড়া বলি শোনো—‘বইমেলাতে ঘুরছিল এক পাঠক/লেখক এসে করল তাকে আটক...’।”

‘আমি জানি আমি জানি!’ বলতে ইচ্ছা হচ্ছিল রাহেলার। কিন্তু বলল না। তার মনে হচ্ছে, সে যেন বড় হয়েছে, আর দাদুর আজ ছোট হতে ইচ্ছা হচ্ছে!

হঠাৎ দাদুর সামনে সুতা কেটে উড়ে এসে পড়ল একটা ঘুড়ি। খবরের কাগজ দিয়ে বানানো সেটা। সেখানে মোটা কালো অক্ষরের দিকে তাকিয়ে চুপ হয়ে গেলেন দাদু। লেখা আছে, ‘জ্বলছে মধ্যপ্রাচ্য, মিসাইলের আঘাতে তেহরানের এক স্কুলে ১৬৫ শিশু নিহত।’ কিছুক্ষণ চুপচাপ থেকে হঠাৎ দাদু কাগজটা ছিঁড়ে ঠোঙা বানালেন, বললেন, ‘চলো দাদু, এটায় করে সাদা বোঁদে খাই! ছিদাম ময়রার বানানো, একবার খেলে তোমার আর ঢাকায় ফিরতে ইচ্ছাই করবে না হে হে হে...!’

রাহেলাও হেসে উঠল, ঝুলনায়ও জোরে একটা দোলা লাগল, সেটা বাতাসে না বটগাছের আনন্দে বোঝা গেল না।

সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন

Mahfuzur Rahman

Editor & Publisher