তামজিদ যখন ছোট ছিল, অ আ পারত না, এ বি সি পারত না, নামতা পারত না, বানান পারত না—তামজিদের মা তানিয়া এসব কথা বলে, তামজিদের বিশ্বাসই হয় না—সে কখনো ছোট ছিল নাকি?—মা যখন বলে, ছিল হয়তো, এখন বড় হয়ে গেছে। বহুদিন আগে শীতকালে স্কুলে ভর্তি হয়ে গেছে।
নার্সারি ওয়ানে পড়ে। সব পারে—অ আ ক খ, এ বি সি ডি, নামতা, বানান। দুই দিন আগে মাকে জিজ্ঞেস করেছে, আমার বানান আ দিয়ে না লিখে য়-এ আ-কার দিয়ে লিখলে ভুল হবে কেন?
স্কুলে তানজিমের অনেক বন্ধু। সবিশেষ বন্ধু দুজন।
হাফসা ও নাইমা। নাইমা চশমিস। তারা তাদের আম্মুদের সঙ্গে তামজিদদের বাসায় আসে। তখন খুবই ব্যস্ত হয়ে পড়ে তামজিদ।
মায়ের ঘরে ঢুকে ওয়ার্ডরোব খোলে। তামজিদের অনেক প্যান্ট আর টি-শার্ট। কমলা টি-শার্ট, না সবুজ টি-শার্ট, নাকি ‘ইয়াহু’ লেখা লাল টি-শার্ট পরবে, প্যান্ট কোনটা পরবে, হাফসা নাইমারা এলে এসব নিয়ে খুবই চিন্তায় পড়ে যায় তামজিদ।
এখন সন্ধ্যা। মা-ছেলে ঘরে।
তামজিদ মায়ের ফোনে ‘মাশা অ্যান্ড দ্য বিয়ার’ কার্টুন দেখছে। তানিয়া ছেলের বই-খাতা গোছাচ্ছে। বাংলা খাতা, ইংলিশ খাতা, অঙ্ক খাতা, ড্রয়িং খাতা। তানিয়া ড্রয়িং খাতা খুলে দেখল। আম, ফুল, পতাকা, নদী, রংধনু ড্রয়িং করেছে তামজিদ। এক পাতায় দুইটা মেয়ে আর একটা ছেলে ড্রয়িং করেছে। লিখে রেখেছে কে কোনজন, হাফসা-আমি-নাইমা। না লিখলেও যে কেউ বুঝত। চুল ঝুঁটি মেয়েটা হাফসা, ছেলেটা তামজিদ, চশমিস মেয়েটা নাইমা। তানিয়া মুগ্ধ হলো।
‘তামজিদ।’
‘বলো।’
‘হাফসা নাইমার ছবি এঁকেছ, আমার একটা ছবি তো তুমি আঁকো নাই, বাবা।’
‘তোমার এ জন্য মন খারাপ হয়েছে?’
‘মন খারাপ হবে না, বলো?’
‘অল্প মন খারাপ হয়েছে, নাকি অনেক বেশি মন খারাপ হয়েছে?’
‘অল্পও, অনেক বেশিও।’
‘মন খারাপ কোরো না। কার্টুন শেষ হয়ে যাবে। তখন আমি তোমার ছবি এঁকে দেব।’
আশ্বস্ত হলো তানিয়া।
কার্টুন শেষ হয়ে গেল।
মায়ের লক্ষ্মী ছেলে তামজিদ। রং-পেনসিলের বাক্স আর ড্রয়িং খাতা নিল। ড্রয়িং করল, রং করল। মাকে দেখাল, ‘এই দেখো তুমি।’
তানিয়া ডবল না ট্রিপল মুগ্ধ হলো। মানে মুগ্ধ মুগ্ধ মুগ্ধ।
‘ওরে, এটা সত্যি আমি তো! আমার নামটাও লিখে দাও তাহলে।’
‘তোমার নাম...?’
‘কেন আমার নাম তুমি জানো না? বলো, আমার নাম কী বলো?’
‘তানিয়া!’
‘হ্যাঁ, তানিয়া। লিখে দাও, তানিয়া।’
‘আচ্ছা লিখি।’
‘তানিয়া বানান?’
ত-এ আ-কার, ন-এ ই-কার...তামজিদ লিখল। তারপর? তারপর য়-এ আকার কী করে লিখতে হয় ভুলে গেল। মনেই করতে পারল না। একদম মনেই করতে পারল না।
তানিয়া বলল, ‘কী হলো তামজিদ?’
‘তোমার নাম তো তানি-ই ভালো, মা।’ তামজিদ বলল।
তানিয়া বলল, ‘অ-অ-অ! য়-এ আকার তুমি লিখতে পারছ না!’
‘তিন অক্ষরের নাম, মা!’
‘ও বাবা! তোমার বন্ধু হাফসা, নাইমার নাম কি দুই অক্ষরের নাকি? তাদের নাম তো ঠিকই লিখতে পেরেছ।’
‘তোমার নাম তো লিখতে পারছি না। কী করি বলো?’
‘কী আর করবে? তোমার দুই বন্ধুর নামও দুই অক্ষরে লিখে দাও তাহলে। দেখো কী হয়?’
‘কী হবে-এ-এ?’
‘কেন? হাফসার সা বাদ দিয়ে দেখো, হাফসা কেমন হাফ হয়ে যায়, নাইমার মা বাদ দিয়ে দেখো নাইমা কেমন নাই হয়ে যায়!’
তাইতো! তাইতো! এটা কি পারে তামজিদ? হাফসাকে হাফ মানে অর্ধেক করে দিতে পারে? নাইমাকে নাই করে দিতে পারে? একদম না। রক্ষা, য়-এ আকার কিভাবে লিখতে হয়, মনে পড়ে গেল তামজিদের। লিখেও দিল।—তানি এখন তানিয়া হলো। তানিয়ার পর তামজিদ লিখল, মা। ‘তানিয়া মা’ হলো। শেষ হয় নাই। তানিয়ার আগে তামজিদ লিখে দিল, আমার। কথাটা এখন হলো, ‘আমার তানিয়া মা’।
কেন, তানিয়ার তা, তামজিদের তা, মা-ছেলের গল্প, তাতার গল্প।
সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন
Mahfuzur Rahman
Editor & Publisher