সাহিত্য

নিখিলপুরের মজার বুড়ো

আহমেদ সাব্বির

প্রকাশ: ২৫ অক্টোবর ২০২৬ ০২:২২ | ৬৭

আমি তখন খুব ছোট। গ্রামের ইশকুলে ক্লাস টু-তে পড়ি।

আমাদের বাংলা বইয়ের সঙ্গে একটা সহপাঠ বা দ্রুত পঠন বই ছিল। নাম চয়নিকা। ভীষণ প্রিয় ছিল বইটি। পাতা খুললেই অপূর্ব সব ছড়া, কবিতা, গল্প আর ছবি ভেসে উঠত। পড়তে পড়তে মন হরিয়ে যেত কল্পনার রঙিন রাজ্যে। সেই চয়নিকায় আখতার হুসেনের একটা ছড়া ছিল :
‘হ্যাঁ রে খবরটা কি উড়ো?

শুনতে পেলাম নিখিলপুরে চার-চারটে বুড়ো

কাঁদেন কেবল লাগিয়ে চোখে শুকনো মরিচ গুঁড়ো।

আরে, কী বললি দূর

খাবার সময় খায় কি জানিস? বিশটা রুইয়ের মুড়ো।

বয়স ওদের জানিস কত? আট শ নাকি পুরো।

হ্যাঁ রে খবরটা কি উড়ো?’ 

শৈশবের রঙিন উঠান পেরিয়ে আমরা একদিন বড় হলাম। চয়নিকার কথা ভুলে গেলাম একসময়। কিন্তু মাদুরপাতা সন্ধ্যায় কুপির আলোয় পড়া সেই ছড়াটির কথা আজও ভুলতে পারিনি। আখতার হুসেন যেন নিখিলপুরের চার-চারটা বুড়োকে আমাদের মগজে গুঁজে দিয়েছিলেন চিরকালের জন্য।

২০২১ সাল।

একদিন সন্ধ্যায় একটা ফোন এলো। রিসিভ করতেই তিনি বললেন—হ্যালো! আপনি সাব্বির? আমার নাম আখতার হুসেন। আপনার বাসা কি সাতক্ষীরায়? আমি সাতক্ষীরায় একটু বেড়াতে আসতে চাই। আর একটা বই পাঠাব আপনাকে। ঠিকানাটা একটু দিতে পারবেন? আখতার হুসেনের নাম শুনে চমকে উঠলাম। কী বিস্ময়! চয়নিকার সেই আখতার হুসেন! নিখিলপুরের চার-চারটা ‍বুড়ো যেন আবার নড়েচড়ে উঠল। কী কোমল বিনয়ী তাঁর কণ্ঠস্বর! তাঁর সরলতা হৃদয়ে ছড়িয়ে পড়ল। অল্প আলাপেই আমরা বন্ধু হয়ে গেলাম। তার পর থেকে নিয়মিত কথা হতো। যোগাযোগের কমতি হলেই অস্থির হয়ে যেতেন। অভিমান করে বলতেন—কত দিন হয়ে গেল একটু ফোন পাই না। কেমন আছেন? তিনি ছিলেন শিশু-তরুণ-বৃদ্ধ সবার বন্ধু। সবার প্রিয় আখতার ভাই।
আখতার হুসেনের জন্ম ১৯৪৫ সালের ১ নভেম্বর। নাটোরের লালপুর উপজেলার নুরুল্লাপুরে। ১১ ভাই-বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। বাবা ছিলেন রেলের কর্মচারী। স্বল্প আয়ের বড় পরিবার সামলাতে বাবা হিমশিম খেতেন। পিতার আর্থিক টানাপোড়েন সামলাতে তাঁকে কিশোর বয়সেই জীবন-জীবিকার সংগ্রামে নামতে হয়েছিল। ব্যস্ততার কারণে গল্পের পাশাপাশি তিনি ছড়া-কবিতা-গান লিখতে শুরু করেন। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় তাঁর ছড়া-কবিতা প্রকাশ পেতে থাকে। অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁর শিশুতোষ ছড়া ছড়িয়ে পড়ে বাংলা সাহিত্যের উঠানে। স্বকীয়তা ও শৈলীতে আখতার হুসেন হয়ে ওঠেন আধুনিক ছড়াকবিদের একজন।

‘পথখানা আগে আমি ভালো করে মাপলং

দেখলাম বেশ দূরে ভয়ে তাই কাঁপলং

শেষে ভয় করে জয় বাসে আমি চাপলং

আসলাম সোজা চলে ঢাকা থেকে জাফলং।’

আখতার হুসেন গল্প লিখেছেন তোমাদের জন্য। কিন্তু খ্যাতির মোহ তাঁকে কখনোই স্পর্শ করতে পারেনি। গল্পের ভাষা যে কতটা সরল হতে পারে, তাঁর ‘বুড়িমা’ গল্পটি থেকে পাঠ করলেই বোঝা যায়—

‘এক গাঁয়ে এক যে ছিল বুড়ি। একসময় তার সবই ছিল। এখন আর কেউ নেই। না তার ছেলেমেয়ে, না তার স্বামী। কী একটা অসুখে অনেক আগেই তারা মারা গিয়েছিল। গাঁয়ের শেষ মাথায় তার ছনে-ছাওয়া এক চিলতে ঘর। ঝড় এলে তার সেই কুঁড়েঘরের পড়ো-পড়ো দশা হয়। বৃষ্টি হলে পানি চাল চুইয়ে পড়ে। বুড়ির তখন কষ্টের শেষ থাকে না।’

আখতার হুসেন ছয় দশক ধরে লিখেছেন তোমাদের জন্য। তাঁর ছড়া ও শিশুতোষ মৌলিক গ্রন্থ, জীবনী, অনুবাদ, সম্পাদিত গ্রন্থসহ প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা শতাধিক। আনন্দদানের পাশাপাশি তাঁর লেখায় মানবিক ও নৈতিক শিক্ষার বার্তাটি গভীরভাবে ফুটে ওঠে। তাঁর একটি কিশোর কবিতার বইয়ের নাম—‘আমি যেন সারাদিন ভাল হয়ে চলি।’ তোমাদের জন্য আরো যা লিখেছেন সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—‘সমুদ্র অনেক বড়’, ‘রামধনুকের সাঁকো’, ‘আমার দুটো ডানা’, ‘উল্টোপাল্টা’, ‘হালচাল’, ‘ও হাওয়া ও হাওয়া’, ‘পাজি বেড়ালের শাস্তি’, ‘ফ্রিডম ফাইটার’, ‘কর্ণকুসুম ও কালোপাখার প্রজাপতি’, ‘খেলাঘরের পুতুলগুলো’ ইত্যাদি।

সাদাসিধা মিশুক মানুষ ছিলেন তিনি। যেখানেই যেতেন আলো ছড়াতেন। তরুণদের খুব ভালোবাসতেন। উৎসাহ দিতেন। আর দিতেন ভালো লেখার পরামর্শ। তাঁর চেহারায় লাজুক হাসি লেগে থাকত সব সময়। তাঁর গল্পগ্রন্থ ‘সমুদ্র অনেক বড়’ প্রকাশিত হয় ১৯৭০ সালে। সহজ ভাষায় লেখা ‘সাদা ঘুড়ি-কালো ঘুড়ি’, ‘চাকরি’, ‘চাঁদমামার সঙ্গে আলাপ’ ‘খেলনা পুতুল’ ‘সমুদ্র অনেক বড়’ গল্পগুলো তোমাদের জন্য লেখা হলেও বড়দের হৃদয়ে আঁচড় কাটে।

পেশাগত জীবনে তিনি সাংবাদিক ছিলেন। প্রথম সারির বিভিন্ন পত্রিকায় কাজ করেছেন। লেখালেখির পাশাপাশি তিনি বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, খেলাঘর ও উদীচীসহ বিভিন্ন সংগঠনে যুক্ত থেকেছেন। বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন ও খেলাঘরের দলীয় সংগীতের রচয়িতা তিনি। বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন।

মহান মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোতে কলম ধরেছিলেন দেশের স্বাধীনতার সংগ্রামে নিবেদিত বীর সন্তানদের জন্য। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত হতো তাঁর লেখা সেই কালজয়ী গান ‘স্বাধীন স্বাধীন দিকে দিকে জাগছে বাঙালিরা/আজ রুখবে তাদের কারা।’

সাহিত্যে অবদান রাখায় আখতার হুসেন ২০১২ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার পান। এ ছাড়া অগ্রণী ব্যাংক-শিশু একাডেমি শিশুসাহিত্য পুরস্কার, আলাওল সাহিত্য পুরস্কার, ভাষাশহীদ আবদুল জব্বার স্মৃতিপদক, মনিরউদ্দীন ইউসুফ সাহিত্য পুরস্কার, এম নুরুল কাদের শিশুসাহিত্য পুরস্কারসহ অনেক পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন।

চিরকালের শিশু আখতার হুসেন ২৪ সেপ্টেম্বর আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। আকাশের হাতছানিতে মিশে গেলেন চির উজ্জ্বল তাঁরাদের দলে। যুগে যুগে তিনি নিখিলপুরের সেই মজার বুড়ো হয়েই বেঁচে থাকবেন।

সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন

Mahfuzur Rahman

Editor & Publisher