ডোডোর সেদিন মনটা খুব খারাপ। মাসি দিদা কেন ডোডোকে না বলেই বাড়ি চলে গেছে।
আগে যদি বুঝতে পারত তাহলে কিছুতেই ডোডো আজ স্কুলে যেত না। স্কুল থেকে ফিরে রোজকার মতো খাবার খেয়েই একছুটে মাসি দিদার ঘরে। ওখানে গিয়ে তো ও অবাক, মাসি দিদা ঘরে নেই। পুরো ঘর খুঁজেও মাসি দিদার জামা-কাপড়ের লাল ব্যাগটা কোথাও পায়নি।
বুঝতে পারে, মাসি দিদা চলে গেছে। মায়ের ছোট মাসি এই মাসি দিদা। এই বাড়িতে এলে মাসখানেক থেকেই যায়। ফেরার দিন ডোডো কাঁদবেই।
তাই হয়তো না বলে চলে গেছে ডোডোর মাসি দিদা।
তখন ডোডো আর কি করে, কাঁদতে কাঁদতে মায়ের কাছে গেল। মা ভাইকে ঘুম পাড়াচ্ছিল। তাই মুখে আঙুল দেখিয়ে ইশারা করল কথা না বলতে।
রাগে-দুঃখে ডোডোর তখন দুচোখে জল, মা হয়তো সবটা বুঝল।
ইশারায় শুয়ে পড়তে দেখাল ভাইয়ের পাশেই। ডোডোর কি ঘুম আসে? তার গল্প করার সাথি তার রূপকথার দুনিয়ার খোলা জানালাটা ফাঁকি দিয়ে কোথায় চলে গেল? কান্নায় গলা আটকে আসছে দেখে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। মাসি দিদা যে খুব ভালোবাসে ডোডোকে। সারাক্ষণ ডোডোকে নিয়েই থাকত। ভাই হওয়ার পর ডোডোর যে খুব একলা লাগে। তাইতো যখন মাসি দিদা আসে, খুশিতে ভরে ওঠে মন। ডোডো দিদার সঙ্গে তার স্কুলের গল্প করে, মাসি দিদা করে রূপকথার গল্প।
আজ স্কুল থেকে ফিরে এত বড় কষ্ট পেয়েছে তা-ও মা ব্যস্ত? রাগের চোটে তখন ডোডো ছাদের ঘরে গিয়ে ছোট্ট চৌকিতে শুয়ে ভাবতে থাকে, আজকে কেউ তো গল্প বলবে না। কি রে, আজ কোন গল্প শুনবি? জিজ্ঞেস করবে না। হঠাৎ এতক্ষণের চেপে রাখা কান্নাগুলো বেরিয়ে পড়ে বাইরে, হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে ডোডো।
মাসি দিদা কী সুন্দর গল্প বলে—সেই রাজা-রানি-রাজকন্যা-যুবরাজ! ওই তো সাদা ঘোড়ার ওপর হাতে তলোয়ার রাজপুত্রকে নিয়ে ছুটতে ছুটতে আসছে ঘোড়াটা। ধুলায় ঢেকে যাচ্ছে চারদিক। কী তাড়াতাড়ি আসছে ঘোড়াটা। রাজপুত্রের জামাটা কী সুন্দর, চকচকে। মাথায় কী সুন্দর মুকুট! রাজপুত্র কী যেন বলল ডোডোকে। ডোডো দেখে আরেকটা কালো ঘোড়া, উঠে পড়তে বলছে রাজপুত্র। ডোডো যে ঘোড়ায় চড়তেই জানে না। বলল সে, পারব না। কিন্তু রাজপুত্র নাছোড়, অনেকক্ষণের চেষ্টায় উঠে বসে ডোডো। ছুটতে শুরু করেছে কালো ঘোড়াটা। খুব ভয় লাগে ডোডোর, কিন্তু বলতে পারে না রাজপুত্রকে। হাসবে তো শুনে। ডোডো এখন ক্লাস সিক্সে, অনেক বড়। ‘পারি না’ বলতে লজ্জা লাগবে, তাই চেপে লাগাম ধরে রাখে। পৌঁছল তারা একটা নদীর পারে, সূর্য তখন অস্তাচলে। হঠাৎ দেখে অনেক পাখি ঘরে ফিরছে, কিন্তু কী বড় বড় এরা! কী পাখি? আগে তো দেখেনি কখনো সে এমন পাখি। রাজপুত্র একটা পাখিকে কিছু বলে চেঁচিয়ে। পাখিটা মাটিতে বসে পড়ে। ডোডোকে নেমে ওই পাখির পিঠে উঠে বসতে বলে সুন্দর জামার সেই রাজপুত্র। ডোডো তো এর আগে এমন পাখি দেখেইনি, তার পিঠে উঠে কোথায় যাবে কিছুই জানে না। তবু রাজপুত্রকে বলতে পারে না। ডোডোকে নিয়ে উড়তে শুরু করে অদ্ভুত রঙের পাখিটা। পাখির লাল গলাটা জড়িয়ে রাখে ডোডো, রংধনুর রঙের পাখি পাহাড় ডিঙিয়ে উড়তে থাকে। উড়তে উড়তে ডোডো হাত নেড়ে বিদায় জানায় রাজপুত্রকে। সূর্যের কাছে পৌঁছে ডোডোর গরম লাগে। তখন ডোডো বলে, ‘একটু দাঁড়াও পাখি, জল তেষ্টা পেয়েছে।’ পাখি উড়তেই থাকে, কোনো কথাই শোনে না। শেষে চিৎসংর করে ওঠে ডোডো, ‘নামাও আমাকে, আমি মায়ের কাছে যাব।’ কিছুতেই পাখি থামতে চায় না। বেড়ানোর ইচ্ছা একদম নেই ডোডোর তখন। মায়ের জন্য খুব মন কেমন করে।
মাকে বলেও তো যায়নি ডোডো, মা-ও খুঁজছে। ‘মা, ও মা, আমাকে নিয়ে যাও, আমি তোমার কাছে থাকব। আমি ঘুমাব তোমার কাছে।’ কেঁদে কেঁদে বলতে থাকে ডোডো। পাখি শোনেও না, থামেও না। কেঁদে ওঠে ডোডো ‘মা মা’ করে।
হঠাৎ কপালে নরম হাতের ছোঁয়া টের পায়, চোখ খুলে মাকে দেখে খুব খুশি হয় সে। মা বলে, ‘কি রে, স্বপ্নটা কি ভয়ের?’ ডোডোর কাণ্ড দেখে হেসে ওঠে মা। ডোডো বলে না স্বপ্নটা। তার স্বপ্নটা তারই থাক। বলে, ‘বেড়াতে যাচ্ছিলাম, মাসি দিদাকে আনতে যাচ্ছিলাম।’ হেসে ওঠে মা-ছেলে।
সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন
Mahfuzur Rahman
Editor & Publisher