এক কৃষক কাজ করতে করতে হাঁপিয়ে গেলে ক্ষেতের পাশে একটা নিমগাছের তলায় বসে জিরাচ্ছিল। চৈত্র মাস।
ঝকঝকে রোদ। পাশের বনবাদাড় থেকে পাকা কুলের গন্ধ ভেসে আসছে। মাঝে মাঝে মৃদু হাওয়ায় শুকনা পাতায় সরসর শব্দ ওঠে। গন্ধে আর ঝিরঝিরে বাতাসে কৃষকের ঘুম এসে গেল।
একটা নীল পাখি সেখানে এসে বলল, ‘কৃষক ভাই! আমাদের খুব বিপদ!’
কৃষক শুনতে পাচ্ছে। কিন্তু চোখ খুলতে চাচ্ছে না। আধাজেগে ভাবছে, ‘এই তো কিছুক্ষণ হলো এখানে এসে বসলাম, ত্রিসীমানায় কোনো লোক ছিল না, এর মধ্যে এলো কী করে! বোধ হয় ভুলটুল শুনছি, অথবা স্বপ্ন দেখছি!’ কৃষক চোখ খুলছে না দেখে পাখিটি আবার বলল, ‘ও ভাই কৃষক, চোখ খোলো! আমাদের খুব বিপদ!’ কৃষক এবার চোখ না খুলে পারল না। একেবারে মানুষের চেঁচা গলা কানে খোঁচা দিয়ে ঢুকল।
কিন্তু চোখ মেলে কোনো মানুষ দেখতে পেল না। চোখের সামনে ফাঁকা ক্ষেত একলা রোদ পোহাচ্ছে। দূর সীমানায় কলার পাতা হাত নাড়ছে। আর কিচ্ছু নেই। তবে হ্যাঁ, সামনে ঘাসের মধ্যে ঘেঁয়ো ডাবের ওপর একটা নীল রঙের পাখি বসে আছে।
ভারি সুন্দর দেখতে। রোদে তার রং জ্বলজ্বল করছে। পাখি ফ্যাহ্ করে একটু হেসে বলল, ‘এতক্ষণে চোখ খুলেছ তাহলে!’
পাখির মুখ দিয়ে মানুষের কণ্ঠ বের হচ্ছে দেখে কৃষক ভারি আশ্চর্য হলো, ‘ওহ..., তাহলে তুমিই ডাকছিলে!’
‘হ্যাঁ কৃষক ভাই!’
বিশ্বাস হচ্ছে না কৃষকের। কিন্তু জলজ্যান্ত দেখা! না বিশ্বাস করে যাবে কোথায়! ভাবছে, ভূতটুত নয় তো! ভূতেরা অনেক রূপ ধরতে পারে! ‘কিন্তু তুমি মানুষের মতো কথা বলছ কী করে!’
‘তোমাকে বোঝানোর জন্য? আমাদের যে খুব বিপদ! তুমি ছাড়া উপায় নেই, কিন্তু তুমি তো আমাদের ভাষা বুঝবে না, তাই তোমাদের মতো করে বললাম!’
‘সে তো বুঝলাম, কিন্তু মানুষের কণ্ঠ পেলে কোথায়?’
এর উত্তর দিতে ইচ্ছা করছে না পাখির। তাহলে দেরি হয়ে যাবে। কিন্তু কৃষকের গলাটা কেমন শক্ত শোনাল, তাই বলল, ‘আমাদের মধ্যে শুধু আমিই মানুষের মতো কথা বলতে পারি। ছোটবেলা থেকে আমি একটা লেবুগাছে থাকতাম, সেই লেবুগাছের গোড়ায় একটা ফ্যামিলি বাস করত। তাদের ছোট একটা মেয়ে ছিল। সেই মেয়েটি ভালো কথা বলতে পারত না, ওর মা ওকে কোলে করে ভাত খাওয়াত, আর কথা বলা শেখাত। আমি তো গাছেই থাকতাম, খুব মনোযোগ দিয়ে ওর মায়ের শেখানোটা শুনতাম। এই করে করে আমিও মানুষের মতো কথা বলতে শিখেছি।... এখন চলো আমার সঙ্গে!’ পাখি কৃষকের একটা ধুলোমাখা আঙুল ঠোঁটের হাঁ-এর মধ্যে নিল, যেন হাত ধরে টানছে। চেষ্টা করলে কি না হয়। মনে মনে পাখিটিকে খুব প্রশংসা করছে কৃষক। পাখি হয়ে মানুষের কথা আয়ত্ত করছে, আর আমরা মানুষ হয়েও পাখির কথা বোঝার চেষ্টা করি না। কৃষককে নিয়ে পাখি পাশের জঙ্গলে ঢুকল। পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। সরু পথ। রাজ্যের আগাছা হুমড়ি খেয়ে পড়েছে পথের ওপর। কৃষক দেখেশুনে চলছে। বেশ কিছুদূর যাওয়ার পর বড় একটা তেঁতুলগাছ। বিশাল উঁচু ও ঝাঁকড়া, যেন এই জঙ্গলের একটা ছাদ আছে, আর সেই ছাদকে একাই মাথায় করে রেখেছে গাছটা। সেই তেঁতুলগাছের কোলের কাছে একটা খানা আছে। জল বেশি না। চারধার ঘাস আর শ্যাওলায় ভর্তি। তবে শ্যাওলার ফাঁক দিয়ে জলের যে চেহারা দেখা যায়, তাতে মনে হয়—জল যেন জল নয়, জীবন্ত তরল, তেঁতুলের ডালের সঙ্গে কথা বলছে। এই খানার পাশে একটা শিমুলগাছে এসে থামল পাখিটা। বলল, ‘এই শিমুলগাছটা দেখো, কী হাল হয়েছে!’
কৃষক খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পরীক্ষা করল। ডাল-পাতার রং হলুদ। বোঝা যায়—এগুলো আগে সবুজ ছিল। ডালের আগাগুলো শুকিয়ে কালো হয়ে গেছে। কিছু কিছু ডালের ছাল খসে গেছে।
‘আহ্হা, এখানে দেখো না!’ নীল পাখি টুপ করে একটা ডালে উড়ে এসে একটা গর্তের দিকে নজর কাড়ল কৃষকের। সেই গর্তটা যে ডালে, সেই ডালে চির ধরেছে। গর্তটাও দুই ভাগ হয়েছে।
‘আমাদের বাসা, ভেঙে কী হাল হয়েছে দেখো!’
কৃষক ভালো করে দেখছে, ‘তাই তো! এখন ঝড়-বৃষ্টি এলে তো ভারি সমস্যা!’
‘সেটাও সমস্যা না, সমস্যা অন্যখানে।’
‘মানে!’
‘জন্ম-জন্মান্তর থেকে এখানে বাস করছি, এখন এখানে এলে দম লাগে, দেখছ না সবাই চলে গেছে! আর বেশিক্ষণ থাকলে আমার দম আটকে যাবে!’ নীল পাখি উড়ে বেশ দূরে একটা জিবলীগাছে বসল। কাঁটা ঝোপের মধ্য দিয়ে গাছের গোড়ায় চোখ গেল কৃষকের। ধোঁয়ার মতো অসংখ্য কী সব কিলবিল করছে। আজব প্রাণী তারা, খুব আনন্দ হচ্ছে তাদের, যেন বলছে, ‘কোনো বাধা নেই, এখন এই গাছটিকে কুঁরে কুঁরে খাব!’
নীল পাখি বলল, ‘হাঁ করে দেখছ কী! ওই যে করমচা ঝোপের পাশে তাকাও!’ কৃষক দেখল, সেখানে কিসের একটা বোতল মুখখোলা অবস্থায় কাত হয়ে পড়ে আছে। ‘ওটা শিগগির সরাও! ওটাই যত নষ্টের মূল!’ প্রায় চেঁচিয়ে বলল পাখিটি, ‘দেখো সাবধানে! আবার যেন মাটিতে পুঁতে না দাও!’
কৃষক দেখল খুব কড়া কীটনাশক, উপকারী পোকা মেরে ফেলেছে, তাই অন্য বালাই গজিয়েছে ধোঁয়ার মতো। কৃষক বোতলটা সাবধানে তোলার সময়ই গাছটা হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ল। আর তাই দেখে নীল পাখি কাঁদতে কাঁদতে উড়াল দিল উত্তর আকাশে। অনেক দূরে আকাশের গোড়াঢাকা বাঁশঝাড়ের ওপর দিয়ে সে মিলিয়ে গেল। আর কৃষক সেখানকার সেই নীল শূন্যে ছোট্ট ছোট্ট অনেক কথা শুনতে পেল।
সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন
Mahfuzur Rahman
Editor & Publisher