আমেরিকা

আমেরিকা

৯/১১ পরবর্তী যুদ্ধগুলো থেকে শিক্ষা নিতে ব্যর্থ ট্রাম্প!

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০১:৫৫ | ২২

ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার ২৫তম বার্ষিকী আগামীকাল শুক্রবার। ৯/১১-এর পর থেকে মার্কিন প্রেসিডেন্টরা ধাপে ধাপে নিজেদের ক্ষমতা বাড়িয়ে ইচ্ছেমতো যেকোনো স্থানে, যেকোনো সময় যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়ার এখতিয়ার তৈরি করেছেন।

‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নামের ইরান অভিযানের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন সর্বাধিনায়কের যুদ্ধক্ষমতাকে এক অভূতপূর্ব উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। ট্রাম্প তার নিজস্ব পছন্দের এই যুদ্ধ ইরানের বিরুদ্ধে শুরু করেছেন- যাকে তিনি 'বিশ্বের ১নম্বর সন্ত্রাসবাদের পৃষ্ঠপোষক রাষ্ট্র' হিসেবে অভিহিত করেন।

তবে এই সামরিক অভিযানের জন্য কংগ্রেসনের কোনো অনুমোদন, ন্যাটো মিত্রদের সমর্থন কিংবা জাতিসংঘের কোনো প্রস্তাব ছিল না।

সূচনালগ্নে এটি ছিল আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে অপ্রিয় যুদ্ধ; ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ জনগণের পক্ষ থেকেও এতে খুব একটা সমর্থন ছিল না। এমনকি আমেরিকার ওপর তাৎক্ষণিক কোনো হুমকির সুনির্দিষ্ট প্রমাণও ছিল না। ট্রাম্প অতীত যুদ্ধগুলো থেকে কোনো শিক্ষাই নেননি এবং সংঘাত শুরু হওয়ার পর ‘যুদ্ধপরবর্তী পরিস্থিতি’ মোকাবিলার কোনো বাস্তবসম্মত পরিকল্পনাও তার ছিল না।

মার্কিন সামরিক বাহিনী ধ্বংসাত্মক আক্রমণ চালাতে এবং শত্রু দমনে দীর্ঘকাল ধরে সিদ্ধহস্ত। কিন্তু তাদের এই সামরিক কৌশলগুলো যখন কোনো সুস্পষ্ট জাতীয় দূরদর্শিতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়নি, তখন যুক্তরাষ্ট্র ভিয়েতনামের দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধক্ষেত্রে আটকা পড়েছে, কিংবা ইরাকের সাম্প্রদায়িক গৃহযুদ্ধে জড়িয়েছে যা পরবর্তীতে আইসিসের জন্ম দিয়েছিল- অথবা বর্তমান ইরান যুদ্ধের ফলে বিশ্বব্যাপী সম্ভাব্য এক অর্থনৈতিক মন্দাকে ত্বরান্বিত করেছে।

তবে ইরান যুদ্ধের ভিত্তি কেবল ট্রাম্প একাই গড়েননি, তার পূর্বসূরিরাও এর পথ প্রশস্ত করে গেছেন। ৯/১১-এর পরপর আফগানিস্তানে তালেবান ও আল-কায়েদার বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ শুরু হয়েছিল- যা জাতিসংঘ এবং ন্যাটো মিত্রদের সরাসরি সমর্থনে পরিচালিত হয়, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই 'সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ' তার মূল গণ্ডি পেরিয়ে ভিন্ন রূপ নেয়।

পরবর্তীতে ২০০৩ সালে প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের 'প্রতিরোধমূলক যুদ্ধ' নীতির অন্তর্ভুক্ত হয়ে তা ইরাক আক্রমণের অজুহাত হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সেই আক্রমণের ধারাবাহিকতায় শুরু হওয়া রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধে আনুমানিক দুই লাখ ইরাকি বেসামরিক নাগরিক প্রাণ হারান।

এরপর এই সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ আরও বিস্তৃত হয় প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার হাত ধরে। তিনি সেসব দেশেও ব্যাপকভাবে সশস্ত্র ড্রোনের ব্যবহার শুরু করেন, যেসব দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি কোনো যুদ্ধে লিপ্ত ছিল না- যেমন পাকিস্তান ও ইয়েমেন। ড্রোনের সাহায্যে পরিচালিত এসব হামলায় হাজার হাজার সন্দেহভাজন জঙ্গির পাশাপাশি বিপুল সংখ্যক সাধারণ মানুষও নিহত হন।

জাতিসংঘ ও ন্যাটোর সমর্থনে ২০১১ সালে লিবিয়ার একনায়ক মুয়াম্মার গাদ্দাফিকে ক্ষমতাচ্যুত করার সামরিক অভিযানও পরিচালনা করেন ওবামা। তবে তিনি এর জন্য কংগ্রেসে কোনো অনুমতি চাননি।

গাদ্দাফির পতনের ফলে লিবিয়া দীর্ঘ এক দশকের গৃহযুদ্ধে নিপতিত হয় এবং দেশটি আজ অবধি বিভাজিত হয়ে দুটি পৃথক সরকারের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে।

ওবামা পরবর্তীতে স্বীকার করেছিলেন যে, গাদ্দাফির পতনের পর ‘যুদ্ধপরবর্তী পরিস্থিতি’ সামলানোর পরিকল্পনা না রাখাই ছিল তার প্রেসিডেন্সির সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা।

সন্ত্রাসবিরোধী বৈশ্বিক যুদ্ধের এই সময়টিতে যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন কৌশল গ্রহণ ও পরিবর্তন করেছে, যার কয়েকটি মারাত্মকভাবে ব্যর্থ হয়ে উল্টো আঘাত হেনেছে। এর মধ্যে রয়েছে বুশের ইরাক আক্রমণ এবং দেড় দশকেরও বেশি সময় পর আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের দ্বিপাক্ষিক ব্যর্থতা- যে সেনা প্রত্যাহারের চুক্তিটি ট্রাম্পের আমলে স্বাক্ষরিত হলেও তা বাস্তবায়িত হয় প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের আমলে।

আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের অবলম্বী পরিণতি হিসেবে তালেবান পুনরায় দেশটির নিয়ন্ত্রণ নেয়। ইরাক যুদ্ধের ভয়াবহ বিপর্যয় এবং আফগানিস্তান থেকে বিশৃঙ্খল সামরিক প্রত্যাহার স্পষ্ট করে দেয় যে, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই মার্কিন পরাশক্তি আসলে কী করছে সে সম্পর্কে তাদের সুনির্দিষ্ট কোনো ধারণাই ছিল না; যা বিশ্বমঞ্চে যুক্তরাষ্ট্রের সুনাম ও অবস্থানকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ করেছে।

অবশ্য এই সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রের কিছু বাস্তব সামরিক ও কৌশলগত সাফল্যও ছিল। সিআইএ একটি দক্ষ আধাসামরিক সংস্থায় পরিণত হয়ে সন্ত্রাসী দমনে কার্যকর ভূমিকা রাখে। জয়েন্ট স্পেশাল অপারেশন্স কমান্ড প্রায় অব্যবহৃত একটি কাউন্টার-টেররিজম ইউনিট থেকে বিশাল এক সামরিক শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। মার্কিন স্পেশাল ফোর্সেস সফলভাবে আফগান ও ইরাকি পদাতিক বাহিনীর সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারত্ব গড়ে তোলে এবং ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যাজেন্সিস (এনএসএ) অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে শত্রুদের যোগাযোগ ব্যবস্থায় অনুপ্রবেশ করে।

এসব কৌশলগত অগ্রগতির ফলেই আল-কায়েদার শীর্ষ নেতৃত্বকে চিরতরে ধ্বংস করা এবং আইসিসের ভৌগোলিক 'খেলাফত'-এর অবসান ঘটানো সম্ভব হয়েছিল। এর ফলশ্রুতিতে ৯/১১-এর পর মার্কিন ভূখণ্ডে বিদেশি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর পক্ষ থেকে কোনো বড় ধরনের প্রাণঘাতী হামলা ঘটেনি- যা ৯/১১-পরবর্তী চার মার্কিন প্রেসিডেন্টের জন্যই একটি প্রধান জাতীয় নিরাপত্তা সাফল্য হিসেবে গণ্য হয়।

গত শরতে ট্রাম্প অত্যন্ত নাটকীয়ভাবে সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের পরিধি বহুগুণ বাড়িয়ে দেন। লাতিন আমেরিকার মাদক কার্টেলের সন্দেহভাজন সদস্যদের 'মাদক-সন্ত্রাসী' আখ্যা দিয়ে তিনি দাবি করেন যে- তাদের হত্যা করার পূর্ণ অধিকার তার রয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ক্যারিবীয় অঞ্চলে মাদক পরিবহনকারী বেশ কিছু নৌকায় মার্কিন হামলা চালানো হয়।

এরপর ২০২৬ সালের শুরুতে মার্কিন জয়েন্ট স্পেশাল অপারেশন্স কমান্ড ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে গ্রেপ্তার করলে ট্রাম্প তাকেও একজন মাদক-সন্ত্রাসী হিসেবে দাবি করেন।

মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করার এই চমৎকার অপারেশনে উৎসাহিত হয়ে ট্রাম্প দ্রুতই ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র নির্দেশ দেন। ঠিক যেভাবে ৯/১১-এর পর তালেবানকে দ্রুত পরাজিত করার সাফল্য বুশকে উৎসাহিত করেছিল দেড় বছর পর ইরাক আক্রমণ করতে, ট্রাম্পের ক্ষেত্রেও সেটিই ঘটেছিল।

৯/১১-এর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র যা কখনো শিখতে পারেনি তা হলো- যুদ্ধ আপাতদৃষ্টিতে জিতে যাওয়ার পর পরবর্তী দিনগুলো কীভাবে পরিচালিত হবে তার বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা করা। ২০০১ সালের ডিসেম্বরে তালেবান যখন সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়ে সমঝোতার পথ খুঁজছিল, বুশ প্রশাসন তখন কোনো শান্তিপত্র স্বাক্ষর বা চুক্তি করেনি, অথবা একটি সমঝোতায় পৌঁছালে বহু বছরের যুদ্ধ হয়তো এড়ানো যেত।

২০০৩ সালের ৯ই এপ্রিল, ইরাকি বেসামরিক নাগরিক ও মার্কিন সৈন্যরা বাগদাদের কেন্দ্রস্থলে সাদ্দাম হোসেনের একটি মূর্তি ভেঙে ফেলে। ইরাকে সাদ্দাম হোসেনের পতনের পর সৃষ্ট শূন্যতা মোকাবিলায় পরিকল্পনার অভাব সবার জানা, তা সত্ত্বেও ঠিক আট বছর পর ওবামা প্রশাসন গাদ্দাফির পতনের পর লিবিয়া কীভাবে চলবে তার কোনো পরিকল্পনা রাখেনি।

যুক্তরাষ্টের কৌশলগত সাফল্য এবং কেবল সাময়িক সামরিক বিজয়ের মধ্যকার সূক্ষ্ম তফাতটুকু বুঝতে না পারার এই বিভ্রান্তি ইরান যুদ্ধের সময় সবচেয়ে স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।

তেহরানের ধর্মভিত্তিক শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে একাধিক সামরিক জয় অর্জিত হলেও তা সে দেশের শাসনকাঠামোতে কোনো অর্থবহ পরিবর্তন আনতে পারেনি। এমনকি এই সংঘাতের শুরুর দিনগুলোতে স্বয়ং ট্রাম্পও স্বীকার করে বলেছিলেন, 'আপনি এত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাবেন, আর ঠিক পাঁচ বছর পর গিয়ে আবিষ্কার করবেন যে এমন কাউকে ক্ষমতায় বসিয়েছেন যে আগেরজনের চেয়ে কোনো অংশেই ভালো নয়।'

তাদের এই নির্মম পূর্বাভাস মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সত্যে পরিণত হয়েছে। ৯/১১-পরবর্তী মধ্যপ্রাচ্যে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের অত্যন্ত হতাশাচ্ছন্ন ইতিহাস কখনোই এই আত্মবিশ্বাস জোগাতে পারেনি যে, ইরানে আমেরিকা কর্তৃক শীর্ষ নেতৃত্বকে উৎখাত করার প্রকল্পটির কোনো সুসংবাদ বা সুন্দর পরিণতি থাকবে। এর মাঝে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীর ওপর নিজেদের নবঅর্জিত নিয়ন্ত্রণকে কাজে লাগিয়ে ইরানি শাসকগোষ্ঠী বৈশ্বিক অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি তেল ও গ্যাসের বাজারে মারাত্মক অস্থিরতা ও বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে।

৯/১১-এর ২৫ বছর পর, যে যুক্তরাষ্ট্র একসময় নিজেকে বৈশ্বিক শৃঙ্খলার প্রধান রক্ষক ও পরিকল্পনাকারী হিসেবে গর্ব বোধ করত, আজ তারাই বিশ্বের শান্তি ও স্থিতিশীলতার প্রধান বিনাশকারী শক্তিতে পরিণত হয়েছে।

আমেরিকা থেকে আরো পড়ুন

Mahfuzur Rahman

Editor & Publisher