অভিমত

ট্রাম্প যে কারণে ইরান যুদ্ধ থেকে বের হতে পারছেন না

নাসরিন মালিক

প্রকাশ: ২৯ জুলাই ২০২৬ ০২:১৭ | ১০

ছবি: সংগৃহীত

গত কয়েক দিনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একে অপরের ওপর হামলা চালিয়েছে। এ পরিস্থিতি দেখে যে কেউ ভাবতে পারেন, হয়তো অনেক আগেই তাদের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়েছিল। অথচ মাত্র এক মাস আগেই তারা ইসলামাবাদ সমঝোতা নামে একটি চুক্তিতে সই করেছিল। সেই চুক্তির লক্ষ্য ছিল যুদ্ধ শেষ করার প্রক্রিয়া শুরু করা এবং চূড়ান্ত সমঝোতার জন্য ৬০ দিনের সময় নির্ধারণ করা।

বাস্তবতা হলো, সেই চুক্তির পর খুব অল্প সময়ই পেরিয়েছে। কিন্তু এত বেশি কথার লড়াই, হুমকি ও পাল্টাপাল্টি হামলা হয়েছে যে যুদ্ধটি যেন বারবার শুরু ও শেষ হয়েছে বলে মনে হয়। একই ধরনের বক্তব্য, একই ধরনের দাবি, একই ধরনের প্রতিক্রিয়া—সব মিলিয়ে একধরনের ক্লান্তিকর নাটক তৈরি হয়েছে।

কখনো বলা হচ্ছে যুদ্ধ শেষ, আবার বলা হচ্ছে যুদ্ধ চরমে। কখনো ইরানিদের সাহসী বলা হচ্ছে, আবার কখনো তাদের নেতাদের গালমন্দ করা হচ্ছে। কখনো বলা হচ্ছে তারা যুদ্ধবিরতি চায় না, আবার বলা হচ্ছে তারা সেটির জন্য অনুরোধ করছে। হরমুজ প্রণালি কখনো খোলা, কখনো বন্ধ, আবার কখনো আংশিক খোলা বলা হচ্ছে।

পুরো বিশ্ব যেন একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের কাছে বন্দী হয়ে গেছে, যে রাষ্ট্র তার সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তি ব্যবহার করছে ব্যক্তিগত অহংকার ও অজ্ঞতার জন্য। এ যুদ্ধ শুরু হয়েছিল কয়েক সপ্তাহের মধ্যে শেষ হওয়ার আশা নিয়ে। কিন্তু এখন তা ছয় মাসে প্রবেশ করছে। যুক্তরাষ্ট্র এখন ইরানের ওপর বড় আকারে বিমান হামলা বাড়িয়েছে। ইরানও পাল্টা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে, অঞ্চলজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিগুলো লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে। হুতি গোষ্ঠী আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে অবরোধ ঘোষণা করেছে। এ কারণে যুদ্ধ এখন উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে লোহিত সাগর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে।

এ অবস্থায় ট্রাম্পের জন্য যুদ্ধ থেকে বের হওয়া কঠিন হয়ে গেছে। ইরান এখন বুঝে গেছে, হরমুজ প্রণালির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ একটি বড় কৌশলগত শক্তি। এ শক্তি হাতে রেখে তারা সহজে যুদ্ধ শেষ করবে না। আবার ট্রাম্পও এ অবস্থায় যুদ্ধ শেষ করতে পারছেন না।

তিনি যদি শুধু আগের অবস্থায় ফিরে যান, তাতেও তাঁর অবস্থান দুর্বল হবে। আবার পুরোপুরি যুদ্ধেও নামতে পারছেন না। কারণ, স্থলযুদ্ধ হলে তা দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী হবে। এ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের ১৮ জন সেনা নিহত হয়েছেন। কিন্তু পেন্টাগন এ সংখ্যা কম দেখানোর চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।

এখন প্রশ্ন, এরপর কী? বাস্তবতা হলো, ইতিমধ্যে এত খরচ ও ক্ষতি হয়েছে যে যুদ্ধ থামানোর বদলে আরও বেশি অর্থ ও প্রাণ এতে ঢালা হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র এই যুদ্ধে প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলার খরচ করেছে। এখন পেন্টাগন আরও ৬৭ বিলিয়ন ডলার চেয়েছে। হোয়াইট হাউসের বাজেট প্রস্তাব দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার। এই বিশাল ব্যয়ের কারণে দেশের অভ্যন্তরীণ খাতে ব্যয় কমে যাবে।

এ যুদ্ধের প্রভাব শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়; এতে ইরানের শিশু, সাধারণ মানুষ ও অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনীতি ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ঝুঁকিতে পড়ছে। তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে। বিশ্বজুড়ে একই চিত্র দেখা যাচ্ছে।

জ্বালানি খরচ বাড়ছে, সরকারের বাজেটে চাপ তৈরি হচ্ছে। এমন অস্থির সময়ে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা আনার কথা। কিন্তু ট্রাম্প তার পুরোনো শুল্কনীতি শেষ হওয়ার পর নতুন শুল্ক আরোপ করেছেন।

তাঁর দাবি, অন্যান্য দেশ জোরপূর্বক শ্রমের বিরুদ্ধে যথেষ্ট পদক্ষেপ নিচ্ছে না। অনেকের কাছে এই যুক্তি হাস্যকর মনে হতে পারে। কারণ, ট্রাম্প প্রশাসনের এমন নৈতিক উদ্বেগ রয়েছে বলে বিশ্বাস করা কঠিন।

এ পরিস্থিতিতে কোনো ভর্তুকি বা মূল্য নিয়ন্ত্রণই যথেষ্ট নয়। কারণ, বৈশ্বিক জ্বালানি পরিবহন ও উৎপাদনের কেন্দ্রে যে ধাক্কা লেগেছে, তা সামাল দেওয়া সহজ নয়।

পুরো বিশ্ব যেন একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের কাছে বন্দী হয়ে গেছে, যে রাষ্ট্র তার সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তি ব্যবহার করছে ব্যক্তিগত অহংকার ও অজ্ঞতার জন্য।

ট্রাম্প এখন এই যুদ্ধ থেকে বের হতে পারছেন না। শান্তির মূল্য তিনি দিতে পারছেন না। আর তার এই অক্ষমতার খেসারত দিচ্ছে পুরো বিশ্ব।

অভিমত থেকে আরো পড়ুন

Mahfuzur Rahman

Editor & Publisher