দুই বছর কেটে গেছে ভাবতেও অবাক লাগে। কাজের প্রয়োজনে প্রায় প্রতিদিনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের সামনে দিয়ে শহীদ মিনার পার হয়ে হাইকোর্টে আসি।
আসতে আসতে চোখে ভাসে জুলাইয়ের সেই দিনগুলোর কথা। ভেবেছিলাম, অনেক আগেই দেয়ালে আঁকা গ্রাফিতিগুলো মুছে গিয়ে সেখানে ঠাঁই পাবে বাহারি বিজ্ঞাপন। কিন্তু সব গ্রাফিতি এখনো মুছে যায়নি, যেমন হারিয়ে যায়নি সেই শ্রাবণে দেখা স্বপ্নগুলো।
আমরা যারা সে সময় অনন্যোপায় হয়ে রাস্তায় নেমেছিলাম, তারা বিজয়, খ্যাতি কিংবা অন্য কোনো অর্জনের জন্য রাস্তায় নামিনি। নেমেছিলাম কেবল বেঁচে থাকার দাবি নিয়ে। চোখের সামনে এতগুলো মৃত্যু দেখার পর অন্য কোনো উপায় ছিল না আমাদের।
মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে ‘ফাইট অর ফ্লাইট রেসপন্স’। মানে বেঁচে থাকতে হলে হয় লড়াই করো, অথবা পালাও।
মানুষের মস্তিষ্ক তিনটি ভাগে কাজ করে। একটি অংশ তার আশপাশ থেকে সব তথ্য মিলিয়ে পুরো একটি ছবি তৈরি করে। এরপর সেটি চলে যায় অন্য দুটি অংশে। একটি অংশ আদিম, সেখানে আছে হাজার বছরের পুরোনো প্রবৃত্তি। মস্তিষ্কের এই অংশ আমাদের শেখায় হঠাৎ বিপদ দেখলে কীভাবে নিজেকে বাঁচাতে হবে।
আরেকটি অংশ আছে, যেখানে যুক্তি দিয়ে পুরো পরিস্থিতি বিচার করে মস্তিষ্ক। সেখানে তার সামাজিক অবস্থা ও যাপিত জীবনের শেখা সবকিছু মিলিয়ে মানুষ সিদ্ধান্ত নেয়। কোনো আশু বিপদে সবার আগে সাড়া দেয় মস্তিষ্কের আদিম অংশ।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কোনো একটা রাবারের সাপ হঠাৎ দেখলে আমরা অনেকেই লাফিয়ে উঠব, কোনো কিছু ভাবার আগেই। এরপর যখন মস্তিষ্কের যৌক্তিক অংশ পুরো ব্যাপার বুঝে ওঠে, তখন আমরা শান্ত হই।
১৬ জুলাই দুই হাত প্রসারিত করে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করলেন শহীদ আবু সাঈদ। দেশে দেশে যুগে যুগে সে ছবি অসীম সাহসের প্রতীক হয়ে বেঁচে থাকবে। কিন্তু একই সঙ্গে সে ছবি অপার নিষ্ঠুরতার, একজন নিরস্ত্র মানুষকে ঠান্ডা মাথায় হত্যার ছবি। সেই দিকটার কথা কতবার চিন্তা করেছি আমরা? কিন্তু মনের গভীরে দুভাবেই এ স্মৃতি জায়গা করে আছে।
জুলাইয়ে পথ আমাদের টেনে নিয়েছে; কারণ, মস্তিষ্কের গহিন অংশ থেকে বার্তা এসেছে, লড়াই করা ছাড়া বেঁচে থাকার আর কোনো উপায় নেই। হয়তো এরপর মস্তিষ্কের যৌক্তিক অংশও তাতে সায় দিয়েছে। তাই ৩৬ দিনের লড়াইয়ে বারবার ঘরে ফিরে এসেও আবার বেরিয়েছি আমরা। বেরিয়েছি মৃত্যু হতে পারে জেনেও।
এত দীর্ঘ সময় ‘ফাইট অর ফ্লাইট’–এর মধ্যে থাকা দেহ-মনের ওপর যে প্রগাঢ় ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে, তা নিয়ে গত দুই বছরে ভাবার সময় আমরা পেয়েছি খুব কমই। সে সময় কখনো দঙ্গলবাজি ঠেকাতে আবার কখনো সংস্কারের দাবিতে সক্রিয় থেকেছি আমরা। নিজের দিকে ফিরে তাকানো ফুরসত মিলেছে সামান্যই। আবার যখন থামার সুযোগ এসেছে, তখনো হয়তো ছুটে চলতে চেয়েছি, পালাতে চেয়েছি মনের ক্ষত থেকে, ভুলে থাকতে চেয়েছি নিত্যনতুন ব্যস্ততায়।
এর মধ্যেই নির্বাচন হয়েছে, বহু বছর পর গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় একটা সরকার এসেছে। ভেবেছিলাম, তারপর নিজেদের জন্য কিছুটা সময় মিলবে। কিন্তু সংস্কার প্রশ্নে নানা অনিশ্চয়তা, বিশ্বজোড়া অসহনীয় অন্যায় আর অবিচার ক্ষতবিক্ষত করেছে বারবার। লড়াই চালিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা মন থেকে মুছে যায়নি; বরং বারবার সে প্রয়োজনই মুখ্য হয়ে সামনে এসেছে।
এরপর একসময় মনে হয়েছে, আর কোনো শক্তি অবশিষ্ট নেই, অসীম অবসাদে ছেয়েছে দেহ-মন। তবু যুদ্ধ যেন শেষ হওয়ার নয়।
এরই মধ্যে আমার স্ত্রীর কল্যাণে দক্ষিণ কোরীয় লেখক হেমিন সুনিমের লেখা একটি বই হাতে এল। বইয়ের শিরোনামের বাংলা করলে দাঁড়ায়, ‘কেবল জীবনের গতি কমালেই যা দেখা যায়’। সেখানে লেখা একটা কথা মনে খুব দাগ কেটে গেল। আমাদের পৃথিবী ঠিক ততটা বড়, যতটা আমরা মনে করি।
অঞ্জন দত্তর গান ছোটবেলা থেকেই শুনি। এই বয়সে এসে তাঁর একটা নতুন গান শুনলাম ছেলের সুবাদে:
‘আমার জানালা দিয়ে একটুখানি আকাশ দেখা যায়,
একটু বর্ষা, একটু গ্রীষ্ম, একটুখানি শীত,
সেই একটুখানি চৌকো ছবি আঁকড়ে ধরে রাখি,
আমার জানালা দিয়ে আমার পৃথিবী।… ’
মনের জানালা দিয়ে আমরা যে পৃথিবী দেখি, যেভাবে দেখি, সেটাই আমাদের পৃথিবী। সেটা কখনো রঙিন, কখনো বড় ধূসর। আবার কখনো ফেলে আসা সময়ের খুব বড় কোনো ধাক্কা, তীব্র কষ্ট সেই দেখার ধরনটা স্থায়ীভাবে বদলে দেয়। তখন জানালার বাইরে বর্ষা-শেষের আকাশটা যতই হেসে উঠুক না কেন, মনের জলছবিতে তা থেকে যায় বিবর্ণ। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় তা ‘পোস্টট্রমাটিক স্ট্রেস’, আর অবস্থা আরও সঙিন হলে তা রূপ নেয় ‘ডিজঅর্ডার’-এ, সংক্ষেপে ‘পিটিএসডি’।
জুলাইয়ে আমরা যা কিছু নিজ চোখে দেখেছি, অথবা দেখেছি অন্যের চোখে—মুঠোফোনের পর্দায়; তা আমাদের অন্তঃকরণকে চিরতরে বদলে দিয়েছে। সেখান থেকে আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়ার উপায় নেই। সেই রক্তপাত, সেই নিষ্ঠুরতা, সেই ভীতি চিরতরে আমাদের মনে ছাপ ফেলে গেছে।
১৬ জুলাই দুই হাত প্রসারিত করে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করলেন শহীদ আবু সাঈদ। দেশে দেশে যুগে যুগে সে ছবি অসীম সাহসের প্রতীক হয়ে বেঁচে থাকবে। কিন্তু একই সঙ্গে সে ছবি অপার নিষ্ঠুরতার, একজন নিরস্ত্র মানুষকে ঠান্ডা মাথায় হত্যার ছবি। সেই দিকটার কথা কতবার চিন্তা করেছি আমরা? কিন্তু মনের গভীরে দুভাবেই এ স্মৃতি জায়গা করে আছে।
জুলাইয়ের দিকে ফিরে তাকালে আমরা কেবল বিজয়, অর্জন আর লড়াইটার কথা মনে করতে চাই। যে অসহনীয় সুতীব্র কষ্টের মধ্য দিয়ে আমরা গিয়েছি, তা হয়তো আমাদের মন মুছে ফেলতে চায়। কষ্টের কথা আমরা মনে করতে চাই না। কিন্তু সে বেদনা থেকে যায় আমাদের মনের অবচেতন অংশে। নিয়ত প্রভাবিত করে দেহ-মনকে। আবার এই তীব্র কষ্টকে ভুলে থাকতে গিয়ে নিজের একটা অংশের সঙ্গেই সংযোগ হারিয়ে ফেলি আমরা। অনুভূতিগুলো ভোঁতা হয়ে আসে। এর প্রভাব পড়ে আমাদের সম্পর্কগুলোর ওপর, প্রভাব পড়ে নিজের অস্তিত্বের ওপর। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে ‘ডিসোসিয়েশ’।
জুলাইয়ে যাঁরা অঙ্গ হারিয়েছেন, যাঁরা দৃষ্টি হারিয়েছেন, যাঁরা এখনো শরীরে বয়ে বেড়াচ্ছেন অগুনতি ধাতব প্লেট, তাঁদের প্রয়োজনই আমার এখনো ঠিকভাবে পূরণ করতে পারিনি। তাই এখন মনের অদৃশ্য সমস্যা নিয়ে আলাপ বাতুলতা মনে হতে পারে। কিন্তু মনে রাখা প্রয়োজন, একটা পুরো প্রজন্ম এ অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সেখানে স্কুলের শিশুরা আছে, আছে গোটা তারুণ্য।
এই এতগুলো প্রাণ যদি নিজের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়ে মনের মধ্যে অব্যক্ত কষ্ট নিয়ে বেড়ে উঠতে থাকে, তাহলে আমাদের স্বপ্ন দেখাবে কে?
জুলাইকে ঘিরে স্বপ্নভঙ্গ নিয়ে পথেঘাটে অনেক প্রশ্ন শুনি। সে প্রশ্ন মোটেও অমূলক বা অযৌক্তিক নয়। জুলাইয়ের পর যতবার কথা বলেছি, মনে করিয়ে দিতে চেয়েছি নজরুলের ‘শিখা’ কবিতার কথা:
...রে তরুণ, তোমারে হেরিয়া আমি কাঁদি!
অসম্ভবের পথে অভিযান যার
সুদূর ভবিষ্যতে দুর্মদ দুর্বার
সে আজি অতীতে পানে মেলিয়া নয়ন
কেবলই পিছনে চলে, নেতার আদেশে।
তলোয়ার হইয়াছে লাঙলের ফলা!
তোমাদেরই মাঝে আছে নেতা তোমাদের,
তোমাদেরই বুকে জাগে নিত্য ভগবান,
ভয়হীন, দ্বিধাহীন, মৃত্যুহীন তিনি!
তোমারে আধার করি সেই মহাশক্তি
প্রকাশিতে চান নিত্য, চাহো আঁখি খুলি
আপনার মাঝে দেখো আপন স্বরূপ!
কিন্তু এই আপন স্বরূপ খুঁজে পেতে হলে আগে নিজেকে আলিঙ্গন করতে হবে। জুলাইয়ে ক্ষতবিক্ষত আমাদের মনকে তার সব বেদনার ভারসহই গ্রহণ করতে হবে।
অভিমত থেকে আরো পড়ুন
Mahfuzur Rahman
Editor & Publisher