প্রধান অভিযুক্তের রায় আগামী সেপ্টেম্বরে
টিকটক বিরোধে অপহরণ ও নির্যাতন মামলা : তিন বছর পর নিউইয়র্কে নারীসহ দুই বাংলাদেশি দোষী সাব্যস্থ
প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২৬ ০৯:২৯ | ৭১
ছবি: সংগৃহীত
নিউইয়র্কের কুইন্সে টিকটককে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিনের অনলাইন বিরোধ ও ব্যক্তিগত শত্রুতা শেষ পর্যন্ত ভয়াবহ অপহরণ ও নির্যাতনের ঘটনায় রূপ নেয়। এই মামলায় বাংলাদেশি কমিউনিটির এক নারীসহ দুইজনকে দোষী সাব্যস্ত করেছে ফেডারেল জুরি। আদালতের রায় অনুযায়ী, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হওয়া দ্বন্দ্ব বাস্তব জীবনে গিয়ে মারাত্মক ফৌজদারি অপরাধে পরিণত হয়। নিউইয়র্ক কুইন্সের কজ্যামাইকায় ২০২৩ সালের মার্চে ঘটে যাওয়া একটি অপহরণ ও নির্মম নির্যাতনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে আলোচিত এই মামলায় ফেডারেল আদালত সম্প্রতি রায় ঘোষণা করেছে। মামলায় ৪০ বছর বয়সী সুলতানা রাজিয়া এবং তার সহ-অভিযুক্ত সাইয়েদ রুবেল আহমেদকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, টিকটকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলা ব্যক্তিগত বিরোধ ধীরে ধীরে সংগঠিত সহিংস অপরাধে রূপ নেয়।
প্রসিকিউটরদের অভিযোগ অনুযায়ী, ভিকটিম মুবারক দেওয়ান ২০২৩ সালের ২৭ মার্চ জ্যামাইকা, কুইন্স এলাকায় খাবার নিয়ে বাড়ি ফেরার পথে হঠাৎ করে অপহরণের শিকার হন। অভিযোগে বলা হয়, তাকে জোর করে একটি গাড়িতে তুলে নেওয়া হয় এবং এরপর কয়েক ঘণ্টা ধরে কুইন্সের বিভিন্ন স্থানে ঘুরিয়ে নির্মমভাবে নির্যাতন চালানো হয়। আদালতে উপস্থাপিত প্রমাণ অনুযায়ী, অপহরণের পর ভিকটিমকে মারধর করা হয়, মাদকজাতীয় পদার্থ খাওয়ানো হয় এবং অপমানজনক অবস্থায় নগ্ন করে রাস্তায় দাঁড় করানো হয়। এই পুরো সময়ের ঘটনা মোবাইল ফোনে ভিডিও করা হয় এবং পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টিকটকে ছড়িয়ে দেওয়া হয়, যা মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে আদালতে উপস্থাপিত হয়।
প্রসিকিউটরদের দাবি, এই ঘটনার পেছনে একটি সংগঠিত প্রতিশোধমূলক পরিকল্পনা কাজ করছিল, যার নেতৃত্বে ছিলেন একটি সুপারমার্কেটের মালিক আবু চৌধুরী। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি এবং তার সহযোগীরা ভিকটিমকে টার্গেট করে অপহরণ ও
নির্যাতনের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেন। মামলাটি আদালতে “প্রতিশোধমূলক সহিংসতা” হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। সুলতানা রাজিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তিনি সরাসরি অপহরণে অংশ না নিলেও ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে সক্রিয়ভাবে সহিংস কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন। আদালতের নথি অনুযায়ী, তিনি ভিকটিমকে আঘাত করেন এবং একটি ঝাড়ু ব্যবহার করে মারধর করেন বলে সাক্ষ্য-প্রমাণে উঠে আসে। আরও বলা হয়, ঘটনার পর তিনি ভিকটিমকে নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে প্রচারে যুক্ত ছিলেন।
প্রসিকিউটররা আদালতে যুক্তি দেন যে, রাজিয়া এবং অন্যান্য আসামিরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলা বিরোধকে বাস্তব জীবনে নিয়ে গিয়ে পরিকল্পিতভাবে প্রতিশোধ গ্রহণ করেন। তাদের দাবি অনুযায়ী, ঘটনার পর একটি ফোন কলে রাজিয়া ঘটনাটিকে “প্রতিশোধ” হিসেবে উল্লেখ করেন, যা মামলার গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দেয়। অন্যদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা দাবি করেন, ভিকটিম দীর্ঘদিন ধরে অনলাইনে তাদের বিরুদ্ধে হুমকি, অপমান ও ব্যক্তিগত আক্রমণ চালিয়ে আসছিলেন। তাদের মতে, ঘটনাটি পূর্বপরিকল্পিত অপহরণ নয়, বরং দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত বিরোধের প্রতিক্রিয়া। তারা আরও বলেন, আসামিরা ঘটনাটিকে অপহরণ হিসেবে না দেখে একটি সংঘর্ষ বা মারধরের ঘটনা হিসেবে দেখেছিলেন। তবে প্রসিকিউশন এই যুক্তি প্রত্যাখ্যান করে জানায়, ঘটনাস্থলে ভিকটিমকে ঘিরে রাখা, তাকে গাড়িতে তুলে নেওয়া, ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটক রাখা এবং মারধরে সক্রিয় অংশগ্রহণ—সবকিছুই অপহরণ ও সহিংস অপরাধে জড়িত থাকার স্পষ্ট প্রমাণ। আদালতও শেষ পর্যন্ত এই যুক্তির সঙ্গে একমত হয়ে আসামিদের দোষী সাব্যস্ত করে।
মামলার শুনানিতে আরও উঠে আসে টিকটক লাইভ স্ট্রিমিং এবং অনলাইন কনটেন্টকে কেন্দ্র করে চলা দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্বের বিষয়টি। একজন টিকটক ইনফ্লুয়েন্সারের সাক্ষ্য আদালতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, যেখানে তিনি দুই পক্ষের অনলাইন বাকবিতণ্ডা, হুমকি এবং সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো উত্তেজনার বর্ণনা দেন। এই মামলায় আদালত পর্যবেক্ষণ করে যে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলা ব্যক্তিগত বিরোধ কীভাবে বাস্তব জীবনে গিয়ে মারাত্মক অপরাধে রূপ নিতে পারে। বিচারক ও প্রসিকিউটরদের মতে, এটি কেবল একটি ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব নয়, বরং অনলাইন বিদ্বেষের বাস্তব সহিংস রূপ। ফেডারেল আদালত জানিয়েছে, এই মামলার আসামিদের এখন শাস্তি নির্ধারণ পর্যায়ে পাঠানো হয়েছে। দোষী সাব্যস্তদের দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ড হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে এই চক্রের সঙ্গে যুক্ত আরও কয়েকজন অভিযুক্তের বিচার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে এবং আগামী মাসগুলোতে আলাদা ট্রায়াল অনুষ্ঠিত হবে।
বিশেষজ্ঞরা এই রায়কে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলা বিরোধ এবং বাস্তব জীবনের অপরাধের মধ্যে বিপজ্জনক সংযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, অনলাইন প্ল্যাটফর্মে শুরু হওয়া ব্যক্তিগত শত্রুতা যদি নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে, তবে তা কেবল ডিজিটাল সীমার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং বাস্তব জগতেও গুরুতর ফৌজদারি অপরাধে রূপ নিতে পারে। এই মামলার রায় ভবিষ্যতে অনলাইন দ্বন্দ্ব থেকে উদ্ভূত সহিংস অপরাধ মোকাবিলায় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
নিউইয়র্ক থেকে আরো পড়ুন
Mahfuzur Rahman
Editor & Publisher