অভিমত

চীনের খপ্পর থেকে যে কারণে তাইওয়ানকে রক্ষা করা দরকার

ইয়ান বুরুমা

প্রকাশ: ১৫ এপ্রিল ২০২৩ ০৪:৪৩ | ২৯৬

বাইডেন বারবার স্বৈরতন্ত্রের বিপরীতে গণতন্ত্রকে রক্ষা করার কথা বলেন। তাঁর সে বক্তব্য আন্তরিক হয়ে থাকলে তাঁকে তাইওয়ানকে মুক্ত রাখতেই হবে।
চীন যদি তাইওয়ান দখল করার জন্য অভিযান চালায়, তাহলে তার প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র কী করবে, কেউ জানে বলে মনে হচ্ছে না। দশকের পর দশক ধরে মার্কিন নেতারা এই প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়ার জন্য তাঁদের সাধ্যমতো সবকিছুই করে গেছেন।

কিন্তু গত বছরের সেপ্টেম্বরে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ওয়াশিংটনের ‘কৌশলগত অস্পষ্টতা’ রক্ষার নীতি থেকে সরে এসে খুব খোলামেলাভাবে বলেছেন, তাইওয়ানে ‘নজিরবিহীন হামলা’ হলে মার্কিন সেনাবাহিনী দ্বীপটির পাশে দাঁড়াবে। অবশ্য বাইডেন এ কথা বলার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তারা পিছু হটে ঘোষণা করেন, যুক্তরাষ্ট্রের তাইওয়ান-নীতি আগের মতোই আছে; সে নীতিতে কোনো পরিবর্তন আসেনি।

১৯৬০ সালের যুক্তরাষ্ট্র-জাপান প্রতিরক্ষা চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, জাপানের ভূখণ্ড কখনো আক্রান্ত হলে যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধে নামতে হবে এবং জাপানকে সর্বাত্মক সহায়তা দিতে হবে। 

কিন্তু তাইওয়ানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সে ধরনের কোনো চুক্তি নেই। তাই চীন যদি তাইওয়ানে হামলার সিদ্ধান্ত নিয়েই থাকে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র কী প্রতিক্রিয়া দেখাবে, তা নিয়ে দেশটিকে ভাবতে হবে। তবে কৌশলগত অস্পষ্টতা যদি চীনের তাইওয়ান হামলা ঠেকানোর হাতিয়ার হয়ে থাকে, তাহলে সেই হাতিয়ার আজকের দিনে কতটা যথেষ্ট, সেটিই আসল প্রশ্ন।

কারণ, ১৯৫৮ সালে তাইওয়ান প্রণালি সংকটের সময় কোয়েময় এবং মাতসু দ্বীপপুঞ্জে গোলাবর্ষণ করে তাইওয়ানকে চিয়াং কাইশেকের জাতীয়তাবাদীদের কাছ থেকে ‘মুক্ত’ করার চেষ্টা করার সময় চীন যতটা শক্তিধর ছিল, সে তুলনায় দেশটির শক্তি ও ক্ষমতা এখন বহুগুণ বেশি। তখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাইওয়ানের পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি ছিল এবং আমেরিকান নেতারা মূল ভূখণ্ডে পরমাণু হামলার জন্য তাইওয়ানকে চাপ দিয়েছিলেন।

আজ চীনের কাছে সেনাসংখ্যার দিক থেকে বিশ্বের বৃহত্তম সামরিক বাহিনী এবং যথেষ্ট পারমাণবিক অস্ত্রাগার রয়েছে। চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং ভালো করেই জানেন, যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক যুদ্ধের ঝুঁকি নিতে যাবে না এবং সে কারণেই যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেন যুদ্ধে সরাসরি অংশ নেয়নি। এই চিন্তাটি সি চিন পিংকে সাহসী করে তুলেছে। শক্তিমত্তার দিক থেকে অনেক পেছনে থাকা রাশিয়ার সঙ্গেই যুক্তরাষ্ট্র যেখানে যুদ্ধে জড়াতে চায় না, সেখানে চীনের মতো এত উন্নত অস্ত্রসজ্জিত সুবিশাল বাহিনীর সঙ্গে নিশ্চিতভাবেই তারা লড়াইয়ে জড়াতে চাইবে না।

উদারপন্থীদের আগেকার ধারণা ছিল, মুক্তবাজার অর্থনীতি ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির সম্মিলন ঘটলে অবধারিতভাবেই চীনে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পেয়ে যাবে। দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ানে সামরিক একনায়কত্ব থেকে গণতন্ত্র আসার ঘটনা এই ধারণাকে জোরালো করেছিল বলে মনে হয়। কিন্তু এখন আমরা জানতে পারছি, ‘চীনা চরিত্রের সমাজতন্ত্রের’ অধীনেও পুঁজিবাদ বিকশিত হতে পারে।
২০২৪ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের মাধ্যমে ওয়াশিংটনের সম্ভাব্য রাজনৈতিক পটপরিবর্তন চীনকে বলপূর্বক তাইওয়ানকে দখল করে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে একীভূত করার বিষয়ে আশাবাদী করে তুলতে পারে।

হোয়াইট হাউসে ডোনাল্ড ট্রাম্প কিংবা তাঁর মতো চিন্তাধারার যেকোনো রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট ক্ষমতায় এলে যুক্তরাষ্ট্রকে দূরের দেশগুলোর সঙ্গে ঝগড়াঝাঁটি করা থেকে দূরে রাখার নীতি অনুসৃত হতে পারে। ফলে তাইওয়ানকে নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি দেওয়ার বিষয়টি এখনই ঠিক করে রাখার যৌক্তিকতা রয়েছে। কিন্তু তাইওয়ানকে সমর্থন দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কি পোষাবে? বিশেষ করে, সেখানে যখন একটি বিপর্যয়কর যুদ্ধের ঝুঁকি রয়ে গেছে, তখন তাইওয়ানকে সহায়তা দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কতটা পোষাবে? আমি বিশ্বাস করি পোষাবে। কারণ, তাইওয়ানে হামলা মানে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায় হামলা।

চীন যদি দক্ষিণ ও পূর্ব চীন সাগরে আধিপত্য বিস্তারের সুযোগ করে নিতে পারে, তাহলে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া—উভয় দেশের ওপর চীন অর্থনৈতিকভাবে খবরদারি করতে পারবে। জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া যদি তাদের নিরাপত্তা দেওয়ার বিষয়ে আমেরিকার ওপর ভরসা হারিয়ে ফেলে, তাহলে হয় তাদের চীনের প্রভুত্ব মেনে নিতে হবে, নয়তো দ্রুততার সঙ্গে পরমাণু অস্ত্র জোগাড় করা শুরু করতে হবে। এই দুটো বিকল্পই যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বিপর্যয়কর পরিণতি বয়ে আনবে।

তাইওয়ানে সফরকালে মার্কিন স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি (বাঁয়ে) ও তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট সাই ইং ওয়েন
এ ছাড়া বিশ্বের উন্নত সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের ৯০ শতাংশের বেশি উৎপাদনকারী ভূখণ্ড হিসেবে তাইওয়ানের কৌশলগত গুরুত্ব রয়েছে। চীন তাইওয়ানকে আত্তীকরণ করলে বৈশ্বিক চিপ ইন্ডাস্ট্রিতে চীনের এ–সংক্রান্ত সক্ষমতা বহুগুণ বেড়ে যাবে এবং চীনের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত পরিমণ্ডলে এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়বে।

চীন যদি উদার গণতন্ত্রের দেশ হতো বা নিদেনপক্ষে সেখানে যদি তুলনামূলক মুক্ত মূল্যবোধের সমাজ থাকত, তাহলে এসবের কিছুই বড় ধরনের কোনো সমস্যা হতো না। কিন্তু তা না হওয়ায় তাইওয়ানকে চীনের আগ্রাসন থেকে রক্ষা করাটা অত্যন্ত জরুরি।

পরিহাসের বিষয়, ১৯৫০–এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রের যখন নিরাপত্তা চুক্তিমাফিক তাইওয়ানকে সমর্থন দেওয়ার বাধ্যবাধকতা ছিল, তখন দ্বীপটিতে আজকের মতো গণতন্ত্র ছিল না; তখন দ্বীপটি শাসন করত একটি ভয়ানক উৎপীড়ক স্বৈরাচার সরকার। আমেরিকার চিয়াং কাইশেককে সমর্থন দেওয়ার অর্থ ছিল—কাইশেকের চেয়ে মাও সে–তুং অনেক বেশি নিকৃষ্ট শাসক।

সৌভাগ্যবশত, বিশেষত উত্তর-ঔপনিবেশিক দরিদ্র দেশগুলোর বিপ্লবীদের কাছে ও পশ্চিমা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্যাম্পাসে অল্প সময়ের জন্য যদিও মাওবাদ জনপ্রিয়তা পেয়েছিল, কিন্তু মাওয়ের রক্তক্ষয়ী কৌশলগুলোর বৈশ্বিক আবেদন খুব কমই ছিল। কিন্তু আজকের চীনা মডেলের ওপর বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে অনেক বেশি আস্থা রয়েছে। সোভিয়েত ইউনিয়ন যা পারেনি, চীন সেটি করতে পেরেছে। চীন অর্থনৈতিক সচ্ছলতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে একদিকে উদারনৈতিক প্রত্যাশাকে ধন্দে ফেলে দিয়েছে, অন্যদিকে কঠোর লেনিনবাদী একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

উদারপন্থীদের আগেকার ধারণা ছিল, মুক্তবাজার অর্থনীতি ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির সম্মিলন ঘটলে অবধারিতভাবেই চীনে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পেয়ে যাবে। দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ানে সামরিক একনায়কত্ব থেকে গণতন্ত্র আসার ঘটনা এই ধারণাকে জোরালো করেছিল বলে মনে হয়। কিন্তু এখন আমরা জানতে পারছি, ‘চীনা চরিত্রের সমাজতন্ত্রের’ অধীনেও পুঁজিবাদ বিকশিত হতে পারে।

এখন চীনের আশঙ্কা, তাইওয়ানের গণতন্ত্র ‘ভুল’ আইডিয়া দিয়ে চীনের নাগরিকদের বিভ্রান্ত করতে পারে এবং সে কারণে চীন তাইওয়ানকে গুঁড়িয়ে দিতে চায়, যেটি তারা হংকংয়ের ক্ষেত্রে করেছিল।

বাইডেন বারবার স্বৈরতন্ত্রের বিপরীতে গণতন্ত্রকে রক্ষা করার কথা বলেন। তাঁর সে বক্তব্য আন্তরিক হয়ে থাকলে তাঁকে তাইওয়ানকে মুক্ত রাখতেই হবে।

অভিমত থেকে আরো পড়ুন

Mahfuzur Rahman

Editor & Publisher